যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতা, সামরিক সহযোগিতা ও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াকে বিশ্লেষকেরা বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন না। তবে কানাডা যদি সম্ভাব্য আগ্রাসনের আশঙ্কায় সত্যিই সামরিক প্রস্তুতি নেয়, তাহলে সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে—তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। এরই মধ্যে কানাডার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা জোরদারের বিষয়টি সামনে এসেছে।
কানাডার সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি একটি মডেল সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। ‘গ্লোব অ্যান্ড মেইল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই মডেল অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে প্রথম সপ্তাহেই কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কৌশলগত অবস্থান বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
এর পেছনে মূল কারণ দুই দেশের সামরিক সক্ষমতার বিশাল পার্থক্য। জনবল, বিমান, নৌবাহিনী, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও সামরিক সরঞ্জামের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক শক্তিশালী।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কানাডার প্রতিরোধ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে কানাডার নিয়মিত বাহিনী বড় ধরনের চাপের মুখে পড়লেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতিরোধের ধরন বদলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি কানাডীয় বাহিনী ও স্থানীয় প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা কৌশল গ্রহণ করতে পারে। বিশেষ করে কানাডার বিশাল ভৌগোলিক আয়তন এবং দুর্গম অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সম্ভাব্য সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কানাডার জন্য মিত্রদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো ন্যাটো মিত্রদের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য, কূটনৈতিক সহায়তা এবং অন্যান্য সহযোগিতা চাওয়া হতে পারে।
তবে ন্যাটোর কাঠামো থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে এমন সংঘাত হলে জোটের অন্যান্য সদস্য কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ধরন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় কানাডা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর আকার বাড়ানো এবং বিপুলসংখ্যক নাগরিক-সৈনিককে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত করার প্রস্তাবও সামনে এসেছে।
এর লক্ষ্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা নয়; পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে কানাডার সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
সামরিক সক্ষমতার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে থাকলেও কানাডায় সরাসরি সামরিক অভিযান চালানো ওয়াশিংটনের জন্যও বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ শ্মিডট মনে করেন, এমন নির্দেশ এলে মার্কিন সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও আপত্তি তৈরি হতে পারে। কারণ, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে এবং নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়াও হয়।
অর্থাৎ, যে বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, তাদের অনেকের সঙ্গেই মার্কিন সেনাদের দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে।
সরাসরি সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও অবকাঠামো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে তেল, খনিজ সম্পদ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হতে পারে—এমন সম্ভাবনার কথা আলোচনায় এসেছে।
পাশাপাশি কানাডার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা হতে পারে বলেও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, কোনো আসন্ন যুদ্ধের পূর্বাভাস নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সামরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘদিনের মিত্রতা রয়েছে। ফলে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে দুই দেশের জন্যই এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য অত্যন্ত বড় হবে।
তবে কানাডার সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি একটি বিষয় স্পষ্ট করছে—বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অটোয়াও সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি নতুন করে পর্যালোচনা করছে।
Leave a Reply