এম এ বাছির রাজা, মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের মাধবপুরে গত প্রায় ২০ দিন ধরে রান্নাঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকার অজুহাতে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী গ্রাহকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। নির্ধারিত খুচরা মূল্যের চেয়ে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে।
সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও মাধবপুরের বাজারগুলোতে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়। এমনকি কোথাও কোথাও গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল সরবরাহ
উপজেলা প্রশাসনের প্রাপ্ত তথ্যমতে, উপজেলায় বিভিন্ন এলপিজি কোম্পানির সরবরাহ চাহিদা পূরণ করতে পারছে না:
বসুন্ধরা ও ওমেরা এলপিজি (সেমকো এনার্জি লিমিটেড): প্রতিদিন ৫০০ লিটার চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করছে গড়ে মাত্র ৪০০ লিটার। তাদের আওতায় প্রায় ২৫ জন খুচরা বিক্রেতা রয়েছে। এছাড়া ওমেরার একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি বন্ধ থাকায় সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে।
যমুনা স্পেকট্রাম ও ইউনি গ্যাস (কে.এস.এন. এনার্জি এলপিজি লি.): প্রায় ১,৫০০ লিটার দৈনিক চাহিদার জায়গায় প্রতিদিন যোগান দিচ্ছে ১,০০০ লিটার। প্রায় ৪০০ খুচরা বিক্রেতা তাদের ওপর নির্ভরশীল হলেও ইউনি গ্যাসের একটি ডিলার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বহু ক্রেতাকে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।
সানগ্যাস/ফ্রেশ এলপিজি (সালমা এন্টারপ্রাইজ, ছাতিয়াইন বাজার): প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০০ খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২,৪০০ লিটার এলপিজি বিক্রি করে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।
চরম দুর্ভোগে সাধারণ গ্রাহক
উপজেলার বিভিন্ন বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় অধিকাংশ দোকানেই এলপিজি সিলিন্ডার নেই। হাতে গোনা কয়েকটি দোকানে সিলিন্ডার মিললেও চাওয়া হচ্ছে আকাশচুম্বী দাম।
রান্নার গ্যাস না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়া মাধবপুরের বাসিন্দা জনিকা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিন দিন ধরে রান্নার গ্যাস শেষ। বাজারে ঘুরেও গ্যাস পাচ্ছি না। আর যেখানে পাচ্ছি, সেখানে এত বেশি দাম চাচ্ছে যে আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের পক্ষে সংসার চালিয়ে এই দামে গ্যাস কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
আরেক ভুক্তভোগী ওসমান মিয়া বলেন, “আগে বাজারে গেলে সহজেই মিলত গ্যাস। এখন দোকানে গেলেই বিক্রেতারা বলে ‘গ্যাস নেই’। অনেক খোজাখুঁজির পর পেলেও দিতে হচ্ছে বিশাল অংকের বাড়তি টাকা।”
তবে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি ভিন্ন। রতনপুর বাজারের ব্যবসায়ী জাহের উদ্দিন জানান, কোম্পানি এবং মূল ডিলারদের কাছ থেকেই তারা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছেন না। তারা নিজেরাও বেশি দামে কিনে আনছেন, তাই নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলে বড় অংকের লোকসান গুনতে হবে।
প্রশাসনের বাজার তদারকির নির্দেশ
গ্যাসের এই কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের বিষয়টি নজরে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে উপজেলা প্রশাসন।
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান জানান, “এলপিজি সংকটের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। কেউ যাতে সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য উপজেলা প্রশাসন কঠোর নজরদারি করছে। অতিরিক্ত দাম আদায়ের প্রমাণ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন বাজারে মনিটরিং ও বাজার তদারকি অভিযানের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মৈত্রী রায়কে।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এ সংকটে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর অচল হয়ে পড়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের দাবি—দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
Leave a Reply