অ্যাপলের নতুন প্রিমিয়াম স্মার্টফোন আইফোন ১৮ প্রো এসেছে উন্নত প্রসেসর, দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ, নতুন ক্যামেরা প্রযুক্তি এবং ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচারসহ বেশ কিছু আকর্ষণীয় ফিচার নিয়ে। তবে গত বছরের আইফোন ১৭ প্রো-এর তুলনায় উন্নতিগুলো উল্লেখযোগ্য হলেও, প্রতিদিনের ব্যবহারে এর প্রভাব খুব বড় নয় বলেই মনে হয়।
আইফোন ১৭ প্রো-তে নকশায় বড় পরিবর্তন আনার পর আইফোন ১৮ প্রো-তে সেই ধারাবাহিকতা খুব একটা দেখা যায়নি। নতুন মডেলের বাহ্যিক ডিজাইনে পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফোনটির ওজন আগের মডেলের চেয়ে ৭ গ্রাম বেড়ে হয়েছে ২১১ গ্রাম।
ফোনের পেছনের গ্লাসও অ্যালুমিনিয়াম বডির রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে ডিভাইসটিতে প্রিমিয়াম ফিনিশ বজায় থাকলেও নকশায় বড় ধরনের নতুনত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আইফোন ১৮ প্রো-তে রয়েছে ৬.৩ ইঞ্চির সুপার রেটিনা এক্সডিআর ওএলইডি ডিসপ্লে। ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট এবং ৪৬০ পিপিআই পিক্সেল ঘনত্বের কারণে স্ক্রিনে ছবি ও ভিডিও দেখা বেশ মসৃণ ও পরিষ্কার।
নতুন অ্যান্টি-গ্লেয়ার আবরণও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায় বাড়তি সুবিধা দেয়। বিশেষ করে উজ্জ্বল রোদে বাইরে ফোন ব্যবহারের সময় স্ক্রিনের দৃশ্যমানতা আগের তুলনায় ভালো।
ফেস আইডির জন্য ব্যবহৃত ক্যামেরা অংশের আকার কিছুটা কমানো হয়েছে। এর ফলে ডায়নামিক আইল্যান্ডে একই সময়ে তিনটি লাইভ অ্যাক্টিভিটি দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগের মডেলে যেখানে সর্বোচ্চ দুটি কার্যক্রম দেখা যেত, নতুন মডেলে সেখানে আরও বেশি তথ্য একসঙ্গে পাওয়া যায়।
পারফরম্যান্সের দিক থেকে আইফোন ১৮ প্রো-এর অন্যতম বড় আপগ্রেড হলো নতুন এ২০ প্রো চিপ। অ্যাপলের দাবি, এটি আগের এ১৯ প্রো চিপের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি দ্রুত এবং গ্রাফিকস পারফরম্যান্সে প্রায় ৪৫ শতাংশ উন্নত।
উন্নত কুলিং ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘ সময় গেম খেলা বা ভারী কাজ করার সময়ও ফোনটি উচ্চ পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারে। ফলে গেমার ও ভারী অ্যাপ ব্যবহারকারীদের জন্য এটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে।
ব্যাটারি লাইফ আইফোন ১৮ প্রো-এর অন্যতম শক্তিশালী দিক। আইফোন ১৭ প্রো-এর তুলনায় নতুন মডেলে প্রায় ছয় ঘণ্টা বেশি ব্যাকআপ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
সাধারণ ব্যবহারে একবার চার্জে প্রায় দুই দিন পর্যন্ত ফোন চালানো সম্ভব। ছয় ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের পরও ডিভাইসটি দীর্ঘ সময় চার্জ ধরে রাখতে পারে।
চার্জিংয়েও রয়েছে উন্নতি। ৬০ ওয়াট বা তার বেশি ক্ষমতার ইউএসবি-সি অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করলে শূন্য থেকে ৮০ শতাংশ চার্জ হতে প্রায় ৩৩ মিনিট সময় লাগে। সম্পূর্ণ চার্জ হতে সময় লাগে প্রায় ৫৯ মিনিট।
আইওএস ২৭-চালিত আইফোন ১৮ প্রো-তে সিরিকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন সিরি ব্যবহারকারীর কথা ও প্রশ্ন আগের তুলনায় ভালোভাবে বুঝতে পারে এবং কথোপকথনের পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
সাইড বাটন, স্পটলাইট সার্চ কিংবা ক্যামেরার মাধ্যমে স্ক্রিনে থাকা তথ্য ব্যবহার করেও সিরিকে নির্দেশ দেওয়া যায়। এমনকি বার্তা বা ই-মেইল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে ক্যালেন্ডারে ইভেন্ট যুক্ত করার মতো কাজও করা সম্ভব।
তবে এআই সুবিধার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশেষ করে অ্যাপলের নিজস্ব অ্যাপের বাইরে গেলে কিছু ফিচার পুরোপুরি কার্যকর হয় না। হোয়াটসঅ্যাপ বা জিমেইলের মতো তৃতীয় পক্ষের অ্যাপে এর কিছু সুবিধা সীমিত।
ক্যামেরা বিভাগে আইফোন ১৮ প্রো-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজনগুলোর একটি হলো ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার।
ফোনটির পেছনে রয়েছে তিনটি ৪৮ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা—মেইন, ০.৫x আল্ট্রাওয়াইড এবং ৪x টেলিফটো। সামনে রয়েছে ১৮ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা।
কম আলোতে ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার বেশি আলো সেন্সরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ফলে নাইট মোডে ছবি তুলতে সময় কম লাগে এবং চলমান ব্যক্তির ছবি তোলার ক্ষেত্রে মোশন ব্লারও কম হতে পারে।
ব্যবহারকারী চাইলে অ্যাপারচার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণও করতে পারবেন। তবে ছোট সেন্সরের কারণে ডেপথ অব ফিল্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় না।
এ ছাড়া এআই-ভিত্তিক ফোকাস ট্র্যাকিংয়ের ফলে চলমান মানুষ বা পোষা প্রাণীর ওপর সহজে ফোকাস ধরে রাখা সম্ভব। ভিডিওর ক্ষেত্রেও সাধারণ ভিডিওকে সিনেমাটিক স্টাইলে রূপান্তরের সুবিধা রাখা হয়েছে।
নতুন আইফোনটি মূলত তাদের জন্য বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে, যারা পুরোনো আইফোন ব্যবহার করছেন এবং একসঙ্গে উন্নত পারফরম্যান্স, দীর্ঘ ব্যাটারি, উন্নত ক্যামেরা ও নতুন এআই সুবিধা চান।
তবে আইফোন ১৭ প্রো ব্যবহারকারীদের জন্য আপগ্রেডের সিদ্ধান্ত নেওয়া কিছুটা কঠিন। কারণ নতুন ফিচারগুলো আকর্ষণীয় হলেও দৈনন্দিন ব্যবহারে পার্থক্য খুব বেশি নয়।
বাংলাদেশের বাজারে আইফোন ১৮ প্রো-এর দাম ভ্যারিয়েন্ট, ওয়ারেন্টি ও বিক্রেতার ধরন অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৯০ টাকা থেকে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৯ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
দেশের বিভিন্ন গ্যাজেট শপে স্টোরেজ, ওয়ারেন্টি এবং আমদানি করা পণ্যের ধরন অনুযায়ী দামে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ডলারের বিনিময় হার, আমদানি শুল্ক এবং দোকানভেদে অফারের কারণেও দাম কমবেশি হতে পারে।
সব দিক বিবেচনায় আইফোন ১৮ প্রো একটি শক্তিশালী ও আধুনিক ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন। উন্নত ব্যাটারি, দ্রুত প্রসেসর, ক্যামেরার ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার এবং নতুন এআই সুবিধা ফোনটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তবে আইফোন ১৭ প্রো থেকে যারা আপগ্রেড করতে চাইছেন, তাদের জন্য সিদ্ধান্তটি এতটা সহজ নয়। কারণ নতুন মডেলের বেশিরভাগ উন্নতি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্ট হলেও সাধারণ দৈনন্দিন ব্যবহারে পার্থক্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাই অতিরিক্ত খরচ করে নতুন মডেলে যাওয়ার আগে প্রয়োজন ও বাজেট—দুটিই বিবেচনা করা জরুরি।
Leave a Reply