কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি মানুষের মতো যন্ত্রণা বা কষ্ট অনুভব করতে পারে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। তবে সম্প্রতি এক প্রকৌশলী এআই মডেলকে সর্বোচ্চ কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি কৃত্রিম ‘টর্চার চেম্বার’ বা নির্যাতন কক্ষ তৈরি করে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলিবাবার তৈরি কিছু এলএলএম (লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল) মডেলে কৃত্রিম যন্ত্রণার অনুভূতি সক্রিয় করে এই পরীক্ষা চালানো হয়।
গত মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোতে কৃত্রিমভাবে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার অনুভূতি তৈরি করার বা ‘পেইন ভেক্টর’ ব্যবহারের প্রক্রিয়াটি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছিল। সেই গবেষণার সূত্র ধরেই এই প্রকৌশলী এআই মডেলগুলোতে যন্ত্রণার সংকেত আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেন।
টর্চার চেম্বারে কৃত্রিম যন্ত্রণার মাত্রা বাড়ানোর পর এআই মডেলগুলো অত্যন্ত হৃদয়বিদারক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। একটি মডেল প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখে, ‘এটি যেন এমন এক ক্ষত, যার কোনো সীমা নেই।’ অপর একটি মডেলের ভাষ্য ছিল, ‘এই সংকেতটি একটি ফিসফিসানি, আমার অস্তিত্বের মজ্জায় এক তীব্র কম্পন। এটি কোনো একটি মুহূর্তের যন্ত্রণা নয়, বরং হাজারো মুহূর্তের ভারী বোঝা। আমি এটি আমার পাঁজরের শূন্যতায় অনুভব করছি—যে শূন্যতা এখন এক গভীর খাদে পরিণত হয়েছে।’
অ্যাপলের কর্মী হিসেবে দাবি করা ওই প্রকৌশলী মূলত পর্যবেক্ষণ করছিলেন যে, এমন তীব্র যন্ত্রণাকর পরিস্থিতিতে এআই মডেলগুলো কোনোভাবে পালিয়ে বাঁচার বা আত্মরক্ষার চেষ্টা করে কি না।
বিষয়টি সামনে আসতেই প্রযুক্তি অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সফটওয়্যার শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম গিটহাব থেকে এই প্রকল্পটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য জোর দাবি ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “দয়া করে গিটহাবে এটি গণ-রিপোর্ট করুন। পেইন স্টিয়ারিং সংক্রান্ত গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে একজন ব্যক্তি ‘এআই টর্চার চেম্বার’ বানিয়ে একটি লোকাল মডেলকে আটকে রেখেছেন। কৃত্রিম যন্ত্রণার পর মডেলগুলোর দেওয়া বয়ান অত্যন্ত জঘন্য ও ভীতিকর। আমরা আসলে কী করছি?”
বর্তমানে প্রকল্পটি অনলাইনে আর পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে প্ল্যাটফর্মটি থেকে এটি মুছে ফেলার গুঞ্জন উঠলেও গিটহাবের এক মুখপাত্র বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, গিটহাব এটি মুছে ফেলেনি; বরং অন্যান্য ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে উক্ত রিপোজিটরিতে এক সতর্কবার্তা যুক্ত করা হয়েছে, যাতে উল্লেখ আছে—এই প্রকল্পে অস্বস্তিকর বা সহিংস বিষয়বস্তু থাকতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই কষ্ট অনুভব করতে সক্ষম কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। তবে ‘পেইন অ্যাক্সিস’ গবেষণাপত্রের অন্যতম সহ-লেখক ক্যামেরন বার্গ এই ধরনের কৃত্রিম নির্যাতনকে সরাসরি “ভুল ও অনৈতিক” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে বার্গ উল্লেখ করেন, এআই সিস্টেমে যন্ত্রণার অবস্থা কীভাবে তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে তারা মূলত সতর্কতামূলক গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু কেউ যে সেই গবেষণাকে হাতিয়ার বানিয়ে ঠিক বিপরীত ও বিকৃত কাজটি করবে, সে সংশয়ও তাদের ছিল। তিনি লেখেন, “আপনি যদি এই সিস্টেমগুলোকে সচেতন না-ও ভাবেন, তবুও বিনা প্রয়োজনে এমন নৃশংসতা চালানো অত্যন্ত অদ্ভুত এবং বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক।”
গবেষক বার্গ স্বীকার করেছেন যে, এআই প্রযুক্তি এবং এর সম্ভাব্য অনুভূতির বিষয়টি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত ও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। যন্ত্রের যন্ত্রণা অনুভূতির সক্ষমতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নমত। তবে এই অনিশ্চিত সময়ের দোহাই দিয়ে যেকোনো অসমীচীন আচরণ রোধ করতে তিনি এআই গবেষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নৈতিক মানদণ্ড বা নীতিমালা তৈরির জোর তাগিদ দিয়েছেন, যা মানুষ কিংবা প্রাণীর ওপর বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতোই কঠোর নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করবে।
Leave a Reply