জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে ব্রোঞ্জ পদক জেতা উশু খেলোয়াড় জিন্নাত আক্তারকে ক্রীড়া ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। এখন থেকে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে ভাতা পাবেন তিনি। পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে চার মাস পরপর তার ভাতা পাওয়ার মেয়াদ বাড়ানো হবে।
জাপান থেকে দেশে ফেরার পর জিন্নাতকে সংবর্ধনা দিয়েছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। তাকে এক লাখ টাকা আর্থিক পুরস্কারও দিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
রোববার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ টাওয়ারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জিন্নাতের গলায় এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জ পদকটি পুনরায় পরিয়ে দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাকে স্মারক উপহার দেওয়া হয়।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে জিন্নাতের ব্রোঞ্জ জয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও একজন ক্রীড়াবিদ কীভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য এনে দিতে পারেন, জিন্নাত তার উদাহরণ তৈরি করেছেন।
জিন্নাতের পথটা অবশ্য সহজ ছিল না। প্রতিপক্ষের ডিসকোয়ালিফিকেশনের পর সুযোগ তৈরি হলেও পরের লড়াইয়ে তাকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটি ম্যাচে লড়াই করে হেরে গেলেও তার হাত ধরেই বাংলাদেশের পদক নিশ্চিত হয়।
একটি পদকই পুরো জাতিকে উজ্জীবিত করতে পারে। জিন্নাতের ব্রোঞ্জ পদক উশুর খেলোয়াড়দের যেমন অনুপ্রাণিত করেছে, তেমনি দেশের অন্যান্য খেলায় প্রত্যাশা ও ব্যর্থতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জিন্নাতের মতো দেশের হাজারো ক্রীড়াবিদ রয়েছেন, যারা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই অনুশীলন করে যাচ্ছেন। অনেকেরই উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা নেই, পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা নেই। আধুনিক অনুশীলন সরঞ্জাম ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত।
এরপরও দেশের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন এসব ক্রীড়াবিদ। তাই জিন্নাতের সাফল্য শুধু একটি পদক জয় নয়, বরং সুযোগবঞ্চিত ক্রীড়াবিদদের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অন্যান্য ডিসিপ্লিনের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, শুটিং, হকি, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলায় প্রত্যাশিত সাফল্য না আসায় সংশ্লিষ্টদের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে যেসব ডিসিপ্লিনকে নিয়ে বছরজুড়ে বড় প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর ফলাফল হতাশ করেছে। ফলে এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে বাংলাদেশের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও অর্থায়নের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আরচারি দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনাময় ডিসিপ্লিন হিসেবে বিবেচিত। বিদেশি কোচের অধীনে নিয়মিত অনুশীলনসহ এই খেলায় তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
আরচারির সংগঠক কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়া এবং পরে এশিয়ার পর্যায়েও নেতৃত্বের অবস্থানে উঠে এসেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রত্যাশিত ফল না আসায় আরচারির প্রস্তুতি ও বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া খেলাগুলোর একটি ক্রিকেট। কিন্তু এশিয়ান গেমসের মতো আন্তর্জাতিক আসরে ক্রিকেট থেকেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি।
এশিয়ান গেমসকে ক্রিকেটারদের কাছে অনেক সময় বাড়তি চাপ বা অনাকাঙ্ক্ষিত দায়িত্ব হিসেবে দেখার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অথচ দেশের জনপ্রিয় এই খেলাটির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক আসরে আরও বেশি সাফল্য প্রত্যাশা করে ক্রীড়াপ্রেমীরা।
কাবাডিতেও এবার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশকে হারের মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে সম্ভাবনাময় এই ডিসিপ্লিন থেকেও পদকের আশা শেষ হয়ে যায়।
টেবিল টেনিস, অ্যাথলেটিকস, সাঁতারসহ যেসব ডিসিপ্লিনে এশিয়ার শীর্ষ পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো শক্ত নয়, সেসব খেলায় এশিয়ান গেমসে সাফল্য পেতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এশিয়ান গেমসে সাধারণত তারাই ভালো করে, যারা এশিয়ার বিভিন্ন চ্যাম্পিয়নশিপ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত ভালো পারফরম্যান্স করে। তাই দেশের খেলোয়াড়রা যদি আঞ্চলিক পর্যায়েই ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হন, তাহলে এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে পদক জয়ের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত—সেটিও ভাবার বিষয়।
বাংলাদেশ ১৯৭৮ সাল থেকে এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করছে। ১৯৮৬ সালের এশিয়ান গেমসে বক্সিংয়ে মোশারফ হোসেন প্রথমবারের মতো ব্রোঞ্জ পদক এনে দেন।
এরপর ১৯৯০ সালের এশিয়ান গেমসে পুরুষ কাবাডিতে প্রথম রৌপ্য পদক জেতে বাংলাদেশ। ১৯৯৪ সালেও কাবাডিতে রৌপ্য এবং ১৯৯৮ সালে ব্রোঞ্জ পদক আসে। ২০০২ ও ২০০৬ সালের এশিয়ান গেমসে পুরুষ কাবাডি থেকে রৌপ্য পদক অর্জন করে বাংলাদেশ।
২০১০ সালে ক্রিকেটে স্বর্ণ এবং নারী কাবাডিতে ব্রোঞ্জ জেতে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে ক্রিকেটে রৌপ্য ও নারী কাবাডিতে ব্রোঞ্জ আসে। ২০২২ সালের এশিয়ান গেমসে পুরুষ ও নারী ক্রিকেট দল উভয়ই ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে।
এরই ধারাবাহিকতায় জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে জিন্নাত আক্তারের ব্রোঞ্জ বাংলাদেশের পদক তালিকায় নতুন সংযোজন। তার এই সাফল্য দেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনি ভবিষ্যতে প্রতিটি ডিসিপ্লিনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
Leave a Reply