সৌদি আরবের মক্কায় একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিক—নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটি। তবে ঠিক কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, সে বিষয়ে রাজকীয় কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবরণ অত্যন্ত অস্পষ্ট। এ ঘটনায় যুক্তরাজ্যপ্রবাসী গবেষক ও সমাজবিশ্লেষক লুবনা ফেরদৌসী আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো, ভিয়েনা কনভেনশন এবং প্রবাসীদের অধিকারের আলোকে বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে এক চুলচেরা বিশ্লেষণ পেশ করেছেন।
অভিযোগের অস্পষ্টতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের কথা বলা হলেও অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য বা বিচারপ্রক্রিয়ার বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। লুবনা ফেরদৌসীর মতে, বিচার চলাকালীন এই দুজন নাগরিক বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ বিচারিক আদালতের বিষয় হলেও, অপরাধের ধরন নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায্য বিচার এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার আন্তর্জাতিক অধিকার রয়েছে।
ভিয়েনা কনভেনশন ও কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা
১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্ক বিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী:
কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাকে অবিলম্বে তার কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
আটক ব্যক্তি অনুরোধ করলে নিজ দেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে তা জানাতে হবে এবং কনস্যুলার সাক্ষাতের অধিকার সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে লুবনা ফেরদৌসী উল্লেখ করেছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্বে বাংলাদেশকে অবহিত না করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৩৬ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়েছে—তা বলা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন নথিনির্ভর আইনি যাচাই। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সৌদির কাছে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তোলা:
১. তাদের ঠিক কবে এবং কী পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল?
২. গ্রেপ্তারের সময় তাদের কনস্যুলার অধিকার ও আইনি সহায়তার সুযোগ সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না?
অর্থনৈতিক নির্ভরতা বনাম নাগরিকে অধিকার
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স। শ্রম গ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা অসম। তবে লুবনা ফেরদৌসী মনে করিয়ে দেন, শ্রমবাজার ধরে রাখা বা রেমিটেন্সের প্রয়োজনীয়তা যেন কোনোভাবেই প্রবাসীদের মানবাধিকার ও আইনি অধিকার হরণের ক্ষেত্রে নীরব থাকার নৈতিক অজুহাত হতে পারে না। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরকারের করণীয়
১. নথিনির্ভর কূটনৈতিক তৎপরতা: অন্ধ আবেগ বা শুধু উচ্চকণ্ঠ না হয়ে ভিয়েনা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে সঠিক তথ্য ও নথি দাবি করা।
২. কনস্যুলার সক্ষমতা বাড়ানো: প্রবাসী শ্রমিকরা কোনো অভিযোগে গ্রেপ্তার বা অভিযুক্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে যেন প্রাতিষ্ঠানিক আইনি সহায়তা এবং দূতাবাসের প্রবেশাধিকার পান, সেই নজরদারি জোরদার করা।
৩. প্রমিত আইনি সেবা নিশ্চিত করা: প্রান্তিক ও সাধারণ প্রবাসী শ্রমিকরা প্রবাসে যেন কোনো অবস্থাতেই ন্যায্য বিচারপ্রাপ্তি ও সুরক্ষার সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, তার জন্য দূতাবাসগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়োনো।
একটি উত্তর দিন