অন্যের ধন-সম্পদ ও জীবন আগলে রাখাই যাদের দৈনিক কাজ, তাদের নিজেদের জীবনই যেন সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। আধুনিক নগর জীবনে ব্যাংক, করপোরেট অফিস, আবাসিক এলাকা কিংবা শপিংমলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের ভূমিকা অপরিসীম। তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রাপ্তির খাতাটি প্রায় শূন্য।
অমানবিক ডিউটি ও নামমাত্র বেতন
অধিকাংশ বেসরকারি সিকিউরিটি সংস্থায় কর্মীদের দিনে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত টানা ডিউটি করতে হয়, যা শ্রম আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা উৎসব ছুটি তাদের ভাগ্যে সচরাচর জোটে না। ওভারটাইম সুবিধা না দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করানো হলেও মাস শেষে যে বেতন পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারদরে সংসার চালানো অসম্ভব।
সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি
* স্বাস্থ্যঝুঁকি: দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং অনিয়মিত আহারের কারণে বেশিরভাগ কর্মীরই পিঠের ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক ও হৃদরোগের মতো জটিলতা দেখা দেয়।
* সুরক্ষার অভাব: রাতে বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সুরক্ষা সরঞ্জাম (যেমন: বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, পর্যাপ্ত আলো বা যোগাযোগের আধুনিক মাধ্যম) অধিকাংশ সংস্থাই সরবরাহ করে না।
* ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা: কোনো পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা জীবন বীমার ব্যবস্থা না থাকায় চাকরি শেষে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের। এমনকি দুর্ঘটনায় কর্মক্ষমতা হারালে কোম্পানি থেকে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দৃষ্টান্তও বিরল।
আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা
বেসরকারি নিরাপত্তা খাতকে নীতিমালার আওতায় আনতে ২০০৬ সালে ‘বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা আইন’ করা হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ নেই বললেই চলে। এজেন্সির মালিকদের মুনাফাকেন্দ্রিক মনোভাব এবং যথাযথ সরকারি তদারকির অভাবে এই খাতের শ্রমিকরা চরম শোষণের শিকার হচ্ছেন।
নিরাপত্তাকর্মীরা সমাজ ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, ৮ ঘণ্টার কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যবীমা ও আইনি সুরক্ষা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি। অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হাতগুলো যেন নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে দুঃচিন্তায় না থাকে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর।
Leave a Reply