হাসপাতালের বেডে চিকিৎসাধীন বা মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে সই বা টিপসই নিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নিলেই আইনগতভাবে ভূমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে বদলে যায় না। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও আদালত ব্যবস্থার কাঠামোর আলোকেই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হলো:
১. সম্মতির আইনি বৈধতা (Free Consent)
চুক্তি আইনের (Contract Act, 1872) ১৬ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো চুক্তি বা দলিলে সম্পাদনের জন্য স্বাধীন সম্মতি প্রয়োজন। অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে, ভীতি প্রদর্শন করে কিংবা মানসিক চাপ প্রয়োগ করে (Undue Influence) দলিলে সই বা টিপসই নিলে তা আইনের দৃষ্টিতে বাতিলযোগ্য (Voidable)।
২. মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ
রেজিস্ট্রেশন আইন (Registration Act, 1908) অনুযায়ী, জমি বিক্রয় বা হস্তান্তরের সময় দাতা শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকা এবং সুস্থ মস্তিষ্কে (Sound Mind) সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হওয়া বাধ্যতামূলক। হাসপাতালে থাকা ব্যক্তি যদি ঔষধের প্রভাবে বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো সুস্থ অবস্থায় না থাকেন, তবে সেই দলিলে সই নিলেও তা আইনত গ্রহণযোগ্য হয় না।
৩. হাসপাতাল বা কমিশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি
কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে Sub-Registrar হাসপাতালে গিয়ে ‘কমিশন’ বা পরিদর্শনের মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রির বিশেষ সুযোগ রয়েছে। তবে সেখানে সাব-রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব থাকে দাতা সত্যি স্বেচ্ছায় সই করছেন কি না তা নিশ্চিত করা। যদি সাধারণ উপায়ে রোগীর অসচেতনতার সুযোগে চুরি করে সই নেওয়া হয়, তবে সেটির আইনি কোনো গুরুত্ব থাকে না।
৪. প্রতারণামূলক দলিলের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার
প্রতারণা বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দলিল তৈরি করা হলে ভুক্তভোগী বা তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারীরা দেওয়ানি আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের (Specific Relief Act, 1877) ৩১ ও ৩৯ ধারায় দলিল বাতিলের মামলা (Cancellation of Deed) দায়ের করতে পারেন। একইসাথে দণ্ডবিধির ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারা অনুযায়ী এটি একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ (জালিয়াতি)।
উপসংহার
আইন অনুযায়ী কেবল দলিলে একটি স্বাক্ষর বা টিপসই থাকলেই মালিকানা নিশ্চিত হয় না; এর পেছনে দাতার অবাধ ইচ্ছা, সুস্থ মস্তিষ্ক এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া থাকা আবশ্যক। তাই হাসপাতালে অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে জোরপূর্বক বা কৌশলে নেওয়া সই দিয়ে জমির মালিকানা পাওয়া সম্ভব নয় এবং আদালত এ ধরনের দলিল বাতিল বলে ঘোষণা করেন।
একটি উত্তর দিন