বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের আট দফা দাবিতে রংপুর অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি যখন মাঠে গড়াচ্ছে, ঠিক তখনই দলটির ৩৪ জন সংসদ সদস্য (এমপি) একসঙ্গে ১৭ দিনের দীর্ঘ বিদেশ সফরে গেছেন। এমপিদের সঙ্গে অনেকের পরিবারসহ সফরকারী দলের মোট সদস্য সংখ্যা ৭১ জন। দেশজুড়ে রাজপথের বড় আন্দোলন চলাকালেই বিপুল সংখ্যক আইনপ্রণেতার একসঙ্গে বিদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
সফরের বিবরণ ও রুট: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য
সূত্র জানায়, ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর দুই দফায় সফরকারীরা প্রথমে মালয়েশিয়ায় গিয়ে পৌঁছান। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার এবং বিখ্যাত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া’ (আইআইইউএম) ঘুরে দেখার পাশাপাশি সেদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মাসজলি মালিকসহ বিভিন্ন সরকারি-বিরোধী দলের নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারা।
মালয়েশিয়ার সফর শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর তারা পৌঁছান সিঙ্গাপুরে। সেখানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে (এনটিইউ) একটি সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন তারা। এরপর সেখান থেকে প্রতিনিধি দলটি বর্তমানে ফিলিপাইন সফর করছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্ব শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর তাদের বাহরাইনে যাওয়ার কথা রয়েছে, সেখান থেকে সফরটি শেষ হবে সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের মাধ্যমে। দীর্ঘ এই যাত্রা শেষে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর বা ১ অক্টোবর নাগাদ তাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
সফরসঙ্গী কারা?
৩৪ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে শেরপুর-১ আসনের এমপি হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম, ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, রংপুর-৬ আসনের এমপি মো. নুরুল আমিনসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধিরা রয়েছেন। সংসদ সদস্যদের বাইরে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন এবং লেখক জিয়াউল হকও এই দলের সঙ্গে ভ্রমণ করছেন।
জামায়াতের বক্তব্য: এটি প্রশিক্ষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারের পূর্বনির্ধারিত অংশ
দেশে রাজপথের আন্দোলন চললেও কেন সংসদ সদস্যরা বিদেশে—এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত ও সফররত নেতারা জানান, এটি পুরোপুরি পূর্বনির্ধারিত একটি সফর। রাজনৈতিক কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য নয়, বরং এটি এমপিদের জন্য এক ধরনের শিক্ষামূলক ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করার “প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি”।
সফরকারী দলের অন্যতম সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জানান, জাতীয় সংসদের অধিবেশনের কারণে আগের পরিকল্পনা পিছিয়ে এই সময়ে নির্ধারিত হয়। নতুন নির্বাচিত এমপিদের বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্ট, আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও সংসদীয় শিষ্টাচার সম্পর্কে ধারণা দেওয়াই এ সফরের মূল লক্ষ্য। অন্য এক এমপি হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম একে “গ্রুপ ও ফ্যামিলি সফর” বলেও উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতামত
তবে রাজপথের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও চলমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বিপুলসংখ্যক এমপির একসঙ্গে বিদেশ যাওয়া নিয়ে নাগরিক সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ সদস্যরা যখন একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে বা দলীয় ব্যানারে বিদেশে অবস্থান করেন, তখন সেটির পাবলিক ম্যান্ডেট ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন, যেন কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা ধোঁয়াশা তৈরি না হয়।
একটি উত্তর দিন