ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল বিশ্ব গড়ে তুলতে বিশ্বনেতাদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা জরুরি। একইসঙ্গে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশটি বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
তিনি জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান। চলতি বছরের বাজেটে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রায় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হলেও বড় ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
জলবায়ু মোকাবিলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের লক্ষ্যে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কাজ চলছে। পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন ও সার্কুলার অর্থনীতির মাধ্যমে সবুজ শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় কার্বন বাজার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও এগিয়ে চলছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে—১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সীমা বজায় রাখতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে সুলভ ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ নীতির ভিত্তিতে বিশ্বকে সম্মিলিতভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে সব দেশকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেবেন।
Leave a Reply